ছোট্ট একটি লক্ষ্য, বদলে দিতে পারে পুরো সমাজ

 শৈশবে আমাদের সবাইকে একটি পরিচিত রচনা লিখতে শেখানো হয়—“My Aim in Life”। কেউ ডাক্তার হতে চায়, কেউ শিক্ষক, কেউ ইঞ্জিনিয়ার। আমরা বই খুলে মুখস্থ করি, পরীক্ষার খাতায় লিখে দিই, ভালো নম্বর পাই—কিন্তু খুব কম মানুষই থেমে ভাবি, “আমি সত্যিই কী হতে চাই? আর কেন হতে চাই?”



আমাদের লক্ষ্য নির্ধারণের শিক্ষাটা শুরু থেকেই একটু অসম্পূর্ণ। আমরা পেশাকে লক্ষ্য বানাই, কিন্তু উদ্দেশ্যকে নয়। আমরা ফলাফল কল্পনা করি, কিন্তু প্রক্রিয়াকে নয়। আমরা পরিচয় চাই, কিন্তু দায়বদ্ধতা শিখি না।


কিন্তু যদি লক্ষ্য শেখানোর পদ্ধতিটাই একটু বদলে দেওয়া হতো?

ধরুন, ছোটবেলায় শিক্ষক আমাদের বলতেন—

তোমার জীবনে তিনটি স্তরের লক্ষ্য লিখো:

১. চূড়ান্ত লক্ষ্য (Ultimate Aim)

২. মধ্যবর্তী লক্ষ্য (Intermediate Aim)

৩. তাৎক্ষণিক লক্ষ্য (Immediate Aim)

এই তিন স্তরের পার্থক্য বুঝতে পারলেই জীবন দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে পারে।


চূড়ান্ত লক্ষ্য: মানুষের কল্যাণ


মানুষ হিসেবে আমাদের সবার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত—মানবকল্যাণে অবদান রাখা। এই পৃথিবীতে আমরা কেউ একা নই। আমাদের সাফল্য তখনই অর্থবহ, যখন তা অন্যের উপকারে আসে। একজন চিকিৎসক রোগ সারিয়ে মানুষের জীবন বাঁচান, একজন শিক্ষক জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে ভবিষ্যৎ গড়েন, একজন প্রকৌশলী নিরাপদ সেতু বানিয়ে মানুষের চলাচল সহজ করেন। কাজ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত উদ্দেশ্য একই—মানুষের সেবা।


যদি ছোট থেকেই আমাদের শেখানো হতো যে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হলো সমাজের উপকার করা, তাহলে পেশা আর শুধু আয় বা সম্মানের উৎস থাকত না; তা হয়ে উঠত দায়িত্বের ক্ষেত্র।


মধ্যবর্তী লক্ষ্য: কোন পথে সেবা করব?


চূড়ান্ত লক্ষ্য ঠিক থাকলে পরের প্রশ্ন আসে—আমি কীভাবে এই লক্ষ্য পূরণ করব? এই জায়গাতেই আসে মধ্যবর্তী লক্ষ্য। কেউ হয়তো স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে অবদান রাখতে চান, কেউ শিক্ষা, কেউ প্রযুক্তি, কেউ প্রশাসন, কেউ গবেষণা।


এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা বোঝা। সবাই ডাক্তার হতে পারবে না, সবাই প্রকৌশলীও হবে না। কিন্তু সবাই কোনো না কোনোভাবে অবদান রাখতে পারে। নিজের দক্ষতা, আগ্রহ ও মূল্যবোধ বিশ্লেষণ করে যদি পথ বেছে নেওয়া যায়, তাহলে সেই পথই হবে অর্থপূর্ণ।


দুঃখজনকভাবে আমরা অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের নামকেই লক্ষ্য বানিয়ে ফেলি। নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া, মর্যাদাপূর্ণ পদ পাওয়া—এসব অর্জন অবশ্যই গর্বের। কিন্তু এগুলো মাধ্যম, গন্তব্য নয়। গন্তব্য হলো মানুষের উপকারে নিজেকে কাজে লাগানো।


তাৎক্ষণিক লক্ষ্য: আজ আমি কী করব?


সবচেয়ে অবহেলিত অংশ হলো তাৎক্ষণিক লক্ষ্য। বড় স্বপ্ন দেখাই যথেষ্ট নয়; সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য আজ কী করছি সেটাই আসল।


যদি কেউ শিক্ষক হতে চান, তাহলে আজ থেকেই শেখার অভ্যাস গড়তে হবে, ধৈর্য তৈরি করতে হবে, যোগাযোগ দক্ষতা বাড়াতে হবে। যদি কেউ চিকিৎসক হতে চান, তাহলে বিজ্ঞানের ভিত্তি মজবুত করতে হবে, মানবিকতা চর্চা করতে হবে। যদি কেউ প্রশাসনে যেতে চান, তাহলে নেতৃত্বগুণ, নৈতিকতা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।


তাৎক্ষণিক লক্ষ্য আমাদের দৈনন্দিন কাজকে অর্থ দেয়। এটি আমাদের বলে—আজকের ছোট পদক্ষেপই আগামী দিনের বড় পরিবর্তনের ভিত্তি।


কেন এই কাঠামো জরুরি?


আমরা যখন লক্ষ্যকে কেবল পেশায় সীমাবদ্ধ করি, তখন ব্যর্থতা আমাদের ভেঙে দেয়। কিন্তু যদি চূড়ান্ত লক্ষ্য হয় মানুষের কল্যাণ, তাহলে পথ পরিবর্তন হলেও উদ্দেশ্য বদলায় না। একজন হয়তো ডাক্তার হতে চেয়েছিলেন কিন্তু অন্য পেশায় গেছেন—তবুও তিনি সমাজের সেবা করতে পারেন। কারণ লক্ষ্য পেশা নয়, লক্ষ্য হলো অবদান।


শৈশবেই যদি এই দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়, তাহলে শিশুরা নম্বরের জন্য নয়, উদ্দেশ্যের জন্য পড়াশোনা করবে। তারা নিজের শক্তি-দুর্বলতা খুঁজে বের করতে শিখবে। প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু তা হবে ইতিবাচক। সফলতা হবে ব্যক্তিগত গৌরবের চেয়ে বড়—সমষ্টিগত উন্নতির মাধ্যম।


নরম মাটির মতো মন


শিশুর মন নরম মাটির মতো। তখনই তাকে যেভাবে গড়া যায়, বড় হয়ে সে সেভাবেই দৃঢ় হয়। যদি ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়—“তোমার সাফল্য তখনই পূর্ণ হবে, যখন তা অন্যের উপকারে আসবে”—তাহলে বড় হয়ে সে দায়িত্বশীল নাগরিক হবে।


অন্যদিকে, যদি শুধু বলা হয়—“তোমাকে প্রথম হতে হবে, নামী প্রতিষ্ঠানে পড়তে হবে”—তাহলে লক্ষ্য সীমাবদ্ধ হয়ে যায় ব্যক্তিগত অর্জনে। সমাজের কথা তখন পিছনে পড়ে যায়।


জাতি কি বদলাতে পারে?


একটি দেশের পরিবর্তন বড় নীতিমালা বা প্রযুক্তিগত উন্নয়ন দিয়ে শুরু হয় না; শুরু হয় মানুষের মানসিকতা দিয়ে। যদি প্রতিটি মানুষ নিজের কাজকে মানবকল্যাণের অংশ হিসেবে দেখে, তাহলে কর্মক্ষেত্রে সততা বাড়বে, দায়িত্ববোধ বাড়বে, দুর্নীতি কমবে, সহানুভূতি বাড়বে।


ভাবুন, যদি একজন চিকিৎসক শুধু পেশা নয়, সেবা হিসেবে কাজ করেন; একজন শিক্ষক শুধু চাকরি নয়, জাতি গড়ার দায়িত্ব হিসেবে পড়ান; একজন কর্মকর্তা শুধু ক্ষমতা নয়, দায়িত্ব হিসেবে সিদ্ধান্ত নেন—তাহলে সমাজ কি বদলাবে না?


পরিবর্তন একদিনে আসে না। কিন্তু একটি সঠিক ধারণা হাজারো মানুষের জীবনে ঢুকে গেলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হয়। একটি শিশুকে যদি শেখানো যায়—“তোমার চূড়ান্ত লক্ষ্য মানুষের কল্যাণ”—তাহলে সে বড় হয়ে যেখানেই থাকুক, তার কাজের কেন্দ্রে থাকবে মানবতা।


লক্ষ্য মানে শুধু “আমি কী হবো” নয়; লক্ষ্য মানে “আমি কেন হবো”।

যদি আমরা লক্ষ্যকে তিন স্তরে ভাবতে শিখি—চূড়ান্ত, মধ্যবর্তী, তাৎক্ষণিক—তাহলে জীবনের পথ হবে পরিষ্কার, এবং উদ্দেশ্য হবে গভীর।


একটি ছোট ভাবনার পরিবর্তন, একটি রচনার নতুন কাঠামো—হয়তো সেখান থেকেই শুরু হতে পারে বড় সামাজিক রূপান্তর।


কারণ, একজন সচেতন মানুষের ব্যক্তিগত লক্ষ্যই একদিন পুরো জাতির চেহারা বদলে দিতে পারে

Comments